• Hillbd newsletter page
  • Hillbd rss page
  • Hillbd twitter page
  • Hillbd facebook page
সর্বশেষ
৩০ লক্ষ শহীদদের স্মরণে জুরাছড়িতে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন                    বরকলে বৃক্ষ রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন                    ৩০ লক্ষ শহীদদের স্মরণে রাঙামাটিতে ৫৬ হাজার বৃক্ষরোপণ                    জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে পানছড়িতে সংবাদ সম্মেলন                    পার্বত্য চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সবাইকে কাজ করতে হবে-বৃষকেতু চাকমা                    পলি ও ড্যাম নির্মাণের কারণে কাপ্তাই হ্রদে রুই জাতীয় মাছের উৎপাদন কমছে                    কাপ্তাইয়ে মৎস্য সপ্তাহ উপলক্ষে সংবাদ সন্মেলন                    লামা ও আলীদমে উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান                    পানছড়িতে বিভিন্ন প্রজাতির সাত হাজার বৃক্ষরোপন                    কাপ্তাইয়ে ফলদ বৃক্ষ রোপন পক্ষ ও জাতীয় ফল প্রদর্শনী জমে উঠেনি!                    লামায় ৩বসত ঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে বন্য হাতির পাল                    কাপ্তাইয়ের অতি বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্হ ৯ পরিবারকে টেউটিন ও নগদ টাকা প্রদান                    নানিয়ারচরের ঘিলাছড়িতে এলজিসহ আটক ২                    স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের প্রতিবাদে খাগড়াছড়িতে বিক্ষোভ-সমাবেশ                    আলীকদমে তিন দিনের ফলদ ও বৃক্ষ মেলার উদ্বোধন                    আলীকদমে হাসপাতালের জমি উদ্ধারে গঠিত তদন্ত কমিটির কাজ শুরু                    খাগড়াছড়িতে তথ্য অধিকার বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত                    লামায় মুক্তিযুদ্ধে নিহত ৩০ লাখ শহীদের স্মরনে ৩০ লক্ষ বৃক্ষ রোপন কর্মসূচি                    রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে সেবা গ্রহীতাদের সাথে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের যৌথ সভা                    রাঙামাটিতে যুবদলের বিক্ষোভ-সমাবেশ                    কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের উপর হামলা ও শিক্ষকদের লাঞ্ছিতের ঘটনায় পিসিপি’র নিন্দা                    
 

আর্ন্তজাতিক নারী দিবসে বিশেষ মন্তব্য প্রতিবেদন
আদিবাসী নারীর সমঅধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রথাগত আইন যুগোপযোগী করতে হবে/এ্যাডভোকেট সুম্মিতা চাকমা

: হিলবিডি টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published: 08 Mar 2015   Sunday

বাংলাদেশের দক্ষিণ পুর্বাংশে অবস্থিত পার্বত্য অঞ্চলে বাংলাদেশের প্রায় ৪৫টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ/বৃহত্তম অংশের বসবাস। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিন জেলায় যথাক্রমে- চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, লুসাই, পাংখোয়া, খিয়াং, চাক ও খুমী এই এগারটি ভিন্ন ভাষা-ভাষী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর আদি আবাসভূমি। এছাড়াও বর্তমানে বৃহত্তর বাঙালীসহ কিছু সংখ্যক অহমিয়া, গুর্খা ও সাওঁতাল জনগোষ্ঠীর লোক পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস রয়েছে। অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীসমুহ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পুর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করছে। কথিত আছে, এসব আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নারীরা মূলধারার নারীদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে। ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ, যৌতুক, ফতোয়ার মত নির্যাতনের সংস্কৃতি থেকে আদিবাসী সমাজ মুক্ত।

 

আদিবাসী নারীদের চলাফেরার ক্ষেত্রেও খুব একটা বিধিনিষেধ নেই বললেই চলে। পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত এই আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীসমুহের প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, প্রথা, রীতিনীতিসহ স্বতন্ত্র জীবন পদ্ধতি এবং আর্থ-সামজিক, রাজনৈতিক, ভৌগোলিক পরিবেশ যা বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল ও সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, অনন্য ভূ-প্রাকৃতিক গঠন, পৃথক নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, পৃথক রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিচার ও শাসনব্যবস্থা বরাবর এদেশের অপরাপর অঞ্চলের প্রশাসনিক কাঠামো হতে ব্যতিক্রমধর্মী হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রাক-উপনিবেশিক আমল থেকে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসীরা নিজেদের সমাজ কাঠামো ও শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার্থে সামাজিক রীতিনীতি, প্রথার ভিত্তিতে নিজস্ব আইনী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। ঔপনিবেশিক বৃটিশ শাসনাধীনে ১৯০০ সালের রেগুলেশনের আওতায় সৃষ্ট সার্কেল চীফ, হেডম্যান, কার্বারী এই তিন স্তরের প্রশাসনিক কাঠামো বিধিবদ্ধ আইনে স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি কিছু সংশোধন, পরিমার্জনের পর বর্তমানেও তিন পার্বত্য জেলায় সার্কেল চীফ, হেডম্যান, কার্বারী সমন্বয়ে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী প্রশাসনিক ও বিচার কাঠামো বিদ্যমান রয়েছে।

 

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে পার্বত্য অঞ্চলকে পাহাড়ী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এর বৈশিষ্ট্য রক্ষার্থে বিশেষ শাসন কাঠামোর আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ প্রবর্তিত হয়। সমগ্র বাংলাদেশে প্রচলিত সাধারণ প্রশাসন অর্থাৎ জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোর পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে এই তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সমন্বয়ে বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। এই পরিষদগুলোর উপর আদিবাসী বিচার ও প্রথাগত আইন বিষয়াদি ন্যস্ত করা হয়েছে।

 

তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন (১৯৮৯ সনের ১৯, ২০, ২১ নং আইন) এর ৬৬ ধারা, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইনের (১৯৯৮ সনের ১২ নং আইন) ২২ (ঙ) ধারাতে আদিবাসী সমাজের রীতিনীতি ভিত্তিক প্রথাগত বিচার ব্যবস্থাকে আইনী স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।


প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, বৈষম্য ও নির্যাতন পরস্পর হাত ধরাধরি করে চলে। আদিবাসী সমাজ ব্যবস্থায় ধর্ষণের মত নির্যাতনের প্রচলন না থাকলেও বউ পেটানোর মত নির্যাতনের ঘটনাগুলো বিদ্যমান যা পারিবারিক নির্যাতনের আওতায় পড়ে। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, আদিবাসীদের প্রথাগত আইনও কোনো না কোনোভাবে পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজালে বন্দি। প্রথাগত আইনের মধ্যে আদিবাসী নারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন যা কোনো না কোনো ভাবে নারীর প্রতি নির্যাতনকে জিইয়ে রাখে। আদিবাসীদের জাতিগত সঙ্কট নিরসনের পাশাপাশি অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীসমাজের সমস্যাগুলো নিরসন হওয়া অত্যন্ত জরুরী । এরই প্রেক্ষাপটে আজকের সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে।


আদিবাসী সমাজ ব্যবস্থা ও পাহাড়ী নারীর প্রতি বৈষম্য এবং নির্যাতন
পার্বত্য অঞ্চলের ১১টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী সমাজ ব্যবস্থা মূলতঃ পিতৃতান্ত্রিক এবং নিজস্ব প্রথা ও রীতিনীতি নির্ভর। অন্যান্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মত আদিবাসী সমাজেও নারীরা পুরুষের তুলনায় নীচু মর্যাদাসম্পন্ন। তাদের সংস্কার, ধর্ম বিশ্বাস, লোকাচার, প্রথা ও রীতিনীতির মধ্যেও নারীরা অধ:স্তনতার চিত্রটি ফুটে উঠে। যেমন- অনেক পাহাড়ীদের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস ফলবতী বৃক্ষে নারী চড়লে সে বৃক্ষের ফল পোকায় কাটে, নারীর পরিধেয় বস্ত্র মেলে দেওয়া দড়ির নীচে চলাচল করলে পুরুষের তেজ কমে যায়। খিয়াংদের রীতিনীতি অনুযায়ী ‘ক্যাসে’ বা শিকার লব্দ মাংসের ভাগ নারীরা পায় না। অর্থাৎ বন্টন পরিবার ভিত্তিক না হয়ে পুরুষ ভিত্তিক হয়।  পাংখোয়াদের ‘আপাম আন’ (এক ধরনের মাংসের সুপ) অনুষ্ঠানে পরিবেশনের সময় শুধুমাত্র গণ্যমান্য পুরুষ ব্যক্তিদের দেওয়া হয়, নারীদের নয়।


আদিবাসী পরিবারে এখনো কন্যার চেয়ে পুত্র সন্তান বেশী কাঙ্খিত। কারণ পুত্র সন্তান বংশ মর্যাদার ধারক-বাহক, বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতার অবলম্বন হিসেবে মনে করা হয়। আর কন্যা সন্তান বিয়ে হয়ে চলে যাবে স্বামীর সংসারে, তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কন্যা সন্তানের গুরুত্ব কম। তার বদলে গৃহস্থলী কাজে বুনন, সেলাই, রান্না ইত্যাদিতে দক্ষতা অর্জন অনেক বেশী গুরুত্ব পায়।


আদিবাসী পাহাড়ী নারী বিয়ের পর পিতার পরিবার ছেড়ে স্বামীর সংসারে এসে পিতৃ উপাধির পরিবর্তে স্বামীর উপাধি গ্রহণ করে। তঞ্চঙ্গ্যা ও চাকমা রীতিতে গর্ভবতী নারীর স্বামীর ঘরে বা স্বামীর গোষ্ঠীভুক্ত কারো ঘরে সন্তান প্রসবের নিয়ম আছে। স্ত্রীর পিত্রালয়ে সন্তান জন্মদানকে অশুচী মনে করা হয়।

 

আদিবাসী পরিবারে নারীরা হল পরিবারের মূল চালিকা শক্তি। পুরুষের পাশাপাশি নারীরা জুমে, জমিতে সমান তালে শ্রম দিয়ে আসছে। তাছাড়া রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সন্তানের লালন-পালন, গবাদিপশু পালন, বন থেকে জ্বালানী, তরিতরকারী সংগ্রহসহ সমস্ত গৃহস্থলী কাজের ভার গ্রামীণ পাহাড়ী নারীর উপর ন্যস্ত, শহরে সমাজে শিক্ষিত কর্মজীবি নারীর ক্ষেত্রেও উপার্জনের পাশাপাশি গৃহস্থলী কাজে প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করতে হয়।


একটি বেসরকারী সংস্থার সমীক্ষায় জানা যায় কৃষি ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় বেশী। বীজ বোনা, বীজ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে ফসল তোলা ও বিপণন পর্যন্ত আদিবাসী নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে আদিবাসী নারীরা তাদের প্রথাগত ও লোকজ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে পরিবেশের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। এ সমস্ত কাজের চাপ সামলে পাহাড়ী নারীরা নিজের ও পরিবারের ব্যবহারের জন্য নিজস্ব কোমর তাঁতে কাপড় বুনে, পরিবারের কর্তা ও পুরুষের জন্য চোলাই মদ তৈরী করে। অনেক সময় এ মদের নেশায় বুঁদ স্বামীর পিটুনীও তাকে সহ্য করতে হয়।


পরিবারে ও সমাজে আদিবাসী পাহাড়ী নারীর এ অসামান্য অবদান খুব কমই মূল্যায়ন করা হয়। পরিবারে ও সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। নারীর পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিসত্বাকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কখনোই স্বীকার করে না। নারী সবসময়ই কখনো পিতা, কখনো স্বামী, কখনো পুত্রের অধীনে থাকে। তাই সম্পদের উপর পাহাড়ী নারীর অধিকার অনেকটা তত্ত্বাবধায়কের মতো, মালিকানার নয়। শিক্ষা, উপার্জন ইত্যাদিতে পিছিয়ে থাকা ও পুরুষের উপর নির্ভরশীলতার কারণে পাহাড়ী নারীরা পারিবারিক নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।


জাতিগত নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ইত্যাদির কারণে ভিন্ন সংস্কৃতির আদিবাসী পাহাড়ী নারীরা সহজেই লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়। এ কারণে প্রতিনিয়ত পাহাড়ী নারীরা ধর্ষণ, হত্যা, অপহরণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত এগারটি জনগোষ্ঠীর কোন লিখিত প্রথাগত আইন নেই। যুগ যুগ ধরে জনগোষ্ঠীগুলোর সমাজে ব্যবহৃত প্রাচীন রীতিনীতি প্রথাগত আইন হিসেবে মৌখিকভাবে প্রচলিত হয়ে আসছে। সমাজের বির্বতনের ধারায় যুগের দাবীতে অনেক প্রাচীন প্রথা ও রীতিনীতি বর্তমানে পরিবর্তিত হযেছে। তথাপি পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ও ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক অনেক প্রথা ও রীতিনীতি পাহাড়ী আদিবাসী সমাজে এখনো রয়ে গেছে।


আদিবাসী সমাজে বিয়ে নিবন্ধনের কোন রীতি নেই এবং বিয়ের কোন লিখিত দলিল তৈরী করা হয় না। বিয়ের স্বপক্ষে কোন প্রমাণ্য দলিল না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে নারীরা অসৎ পুরুষের দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে। প্রেমের কারণে অভিভাবকের অমতে বা আর্থিক অসঙ্গতি বা অন্য কোন কারণে সীমিত পরিসরে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে পরবর্তীতে সেই পুরুষ যদি তার স্ত্রীর সাথে বিয়ে অস্বীকার করে তাহলে স্ত্রীর পক্ষে তা প্রমাণ করা কঠিন। এভাবে কিছু অসাধু পুরুষ তার বিয়ে গোপন করে বা অস্বীকার করে অন্য নারীর সাথে সম্পর্ক জড়াচ্ছে বা স্ত্রীকে ত্যাগ করে ভরণপোষণের খরচ দেওয়া থেকে বিরত রয়েছে।


আদিবাসী সমাজে নারীর প্রতি নিগ্রহ ও বৈষম্যের আরেক দিক হল পুরুষের বহু বিবাহ প্রথার অনুমোদন। একজন পুরুষ একাধিক বিয়ে করা বা একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করতে পারে, তবে একজন পুরুষ একই সাথে ঠিক কতজন স্ত্রীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে এরূপ কোন সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রথাগত আইনে উল্লেখ নেই। আদিবাসী সমাজে স্বামী স্ত্রীর জীবদ্দশায় বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ কারণ/ক্ষেত্র রয়েছে। তবে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষের উপর নারীর নির্ভরশীলতার কারণে বিবাহ বিচ্ছেদের ফলে প্রায়শই নারী ন্যায় বিচার ও ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়। আদিবাসী সমাজের মত পুরুষ আধিপত্য সমাজে একজন পুরুষের পক্ষে তার স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ করা যতটা সহজ একজন নারীর পক্ষে তার স্বামীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ করা ততটা সহজ নয়। কোন পুরুষ তার স্ত্রীকে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে চাইলে শুধুমাত্র স্বামীর নির্দেশ মেনে না চলা বা স্বামীর অবাধ্য এই অজুহাতে স্ত্রীকে বিবাহ বিচ্ছেদ দিতে পারে।


কোন কোন ক্ষেত্রে স্ত্রী ও সন্তানকে ভরণপোষণ দেওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য ২য় বিয়ে করার জন্য স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় যাতে স্ত্রী বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে বাধ্য হয়। চাকমাদের ক্ষেত্রে কোন পুরুষ স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে চাইলে কয়েক লোকের (সাক্ষীর) স্বাক্ষরযুক্ত ‘সুরকাগজ’ স্ত্রীর বরাবরে সম্পাদন করে দিলেই বিবাহ বিচ্ছেদ হবে, যদি স্ত্রী তা মেনে নেয়। অন্যদিকে একজন স্ত্রী যেকোন কারণে তার স্বামীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে চাইলে অবশ্যই সামাজিক আদালতের দ্বারস্থ হতে হবে এবং স্বামীর বিরুদ্ধে বিবাহ বিচ্ছেদ চাওয়ার কারন প্রমাণ করতে হবে।


সম্পত্তিতে অধিকার বা উত্তরাধিকার ক্ষমতায়নের প্রধান ভিত্তি। উদাহরণস্বরুপ বলা যায় যে, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, খিয়াং, ত্রিপুরা এবং চাকমা ও মং সার্কেলের অন্তর্ভুক্ত মারমাদের উত্তরাধিকারী রীতি অনুযায়ী কোন ব্যক্তির পুত্র সন্তান বা পুত্র সন্তানগনই সর্বাগ্রে অপ্রতিরোধ্য আইনগত উত্তরাধিকারী। পুত্র সন্তান পিতার স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির মালিক। একাধিক পুত্র সন্তান থাকলে পিতার সমুদয় সম্পত্তির সমান অংশের উত্তরাধিকার লাভ করে। কন্যা এবং স্ত্রী শুধুমাত্র ভরনপোষন পায় তবে দ্বিতীয় স্বামী গ্রহন করলে ভরন-পোষণের অধিকার লুপ্ত হয়। কোন ব্যক্তির পুত্র সন্তান না থাকলে কন্যা সন্তান বা কন্যা সন্তানগণ প্রত্যেকে পিতার সম্পত্তিতে সমান অংশের উত্তরাধিকারী হয়।


উপরোল্লিখিত নারীর এই বৈষম্যপূর্ণ অবস্থানই তার প্রতি নির্যাতন বইয়ে নিয়ে আসে। শুধু শারীরিক নির্যাতনই ‘নির্যাতন’ হিসাবে গণ্য হয় না। ‘মানসিক নির্যাতন’ও নির্যাতনের আওতায় পড়ে। আমরা জানি, নারীর অংশগ্রহণ বর্তমানে সমাজ উন্নয়নের প্রধান নিয়ামক কিন্তু সহিংসতা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়। সহিংসতার ফলে নারীর যথাযথ বিকাশ ও সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাইরে কাজ করার ক্ষমতা, চলাচল ও তথ্যের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই নারীর দারিদ্র্য স্থায়িরুপ লাভ করছে। পারিবারিক নির্যাতন এখনই প্রতিরোধ করা দরকার। এটি একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নির্যাতিতকে নয়, নির্যাতনকারীকে নিন্দা, বিরোধিতা ও প্রতিরোধ করতে হবে। মানবতাবিরোধী এসব অপরাধ নির্মূলকরণে আইনের বাস্তব প্রয়োগের স্বদিচ্ছাটা জরুরি। দরকার সমাজের প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং নারীকে ব্যক্তি ও নাগরিক হিসেবে দেখতে আমাদের মনোগঠনের পরিবর্তন। দরকার পরিবারে ও সমাজে নারীকে ব্যক্তি হিসাবে বিকশিত হতে সহায়তা দান। এপ্রেক্ষাপটে পাহাড়ী নারীর প্রতি বৈষম্য ও নির্যাতন বন্ধ করতে নিম্নলিখিত সুপারিশমালা তুলে ধরছি-


১.আদিবাসী নারীর সমঅধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রথাগত আইন বিশ্লেষণ করে যুগোপযোগী করা এবং তা লিপিবদ্ধ করা।
২. নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক ও অমর্যাদাকর প্রথা ও রীতিনীতিগুলো বর্জন করা।
৩. সম্পত্তিতে আদিবাসী পাহাড়ী নারীর উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা।
৪. সম্পত্তির উপর আদিবাসী পাহাড়ী নারীর উত্তরাধিকার বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৫.আদিবাসী পাহাড়ী সমাজে বিবাহ রেজিষ্ট্রেশনের ব্যবস্থা প্রবর্তন করা।
৬. আদিবাসী পুরুষের বহু বিবাহ বন্ধ করার জন্য প্রথাগত আইনে বহু বিবাহ নিষিদ্ধ করা।
৭. লৈঙ্গিক শ্রমবিভাজন কমিয়ে আনা।
৮.প্রথাগত প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার ভিত্তিতে নারীকে নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৯.প্রথাগত সামাজিক আদালতের রায় এর যথাযথ প্রক্রিয়ায় রেকর্ড সংরক্ষণ করা। রায় লেখা ও রেকর্ড সংরক্ষণের ব্যাপারে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
১০.সামাজিক বিচারের শুনানীতে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।।
১১.আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সংগঠনের মধ্যে লিঙ্গ-সংবেদনশীল কর্মসূচী গ্রহণ করা।
১২.আদিবাসী নারীদের উপর সহিংসতা বন্ধের বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

 

সবশেষে, আমরা মনে করি যে, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে আমরা সবাই ব্যক্তিগতভাবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি। নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন আনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এক্ষেত্রে। নারীর ওপর নির্যাতন আসলে চূড়ান্ত বিচারে আমাদের সবার ওপর নির্যাতন। এঅবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে দরকার সনাতনী ‘সম্মান’, ‘পারিবারিক মর্যাদা’, ‘দুর্নাম’ ইত্যাদি চিন্তার বাইরে বেরিয়ে নির্যাতন প্রতিরোধে সরব হওয়া, এর প্রতিবাদে মুখ খোলা, সংগঠিত হওয়া এবং অবিলম্বে নিকটজনের সহায়তা চাওয়া। আমাদের নীরবতা নির্যাতক-নিপীড়কদের ক্রমাগতভাবে বেড়ে ওঠাকে উৎসাহিত করে। আসুন, আমরা সবাই নীরবতার এই জালকে ছিন্ন করি। কেননা, এক্ষেত্রে সোচ্চার হওয়াই আমাদের অন্যতম রক্ষাকবচ।


লেখক- আইনজীবি ও নারী নেত্রী** প্রতিবেদনটি লেখকের সম্পুর্ন নিজস্ব মতামত**

এই বিভাগের সর্বশেষ
আর্কাইভ