পাহাড়ে নারীদের অধিকার ও ক্ষমতায়নে লড়াই করছেন সূচরিতা চাকমা

Published: 30 Mar 2026   Monday   

পাহাড়ে আদিবাসী নারী-পুরুষের বৈষম্য দুর করতে, নারীদের অধিকার ও ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন সূচরিতা চাকমা। পাহাড়ের সফল এ আদিবাসী নারী তার নিজের হাতে প্রতিষ্ঠা করা বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা প্রোগ্রেসিভ এর মাধ্যমে নারীদের অধিকার ও উন্নয়ন ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী পাহাড়ি নারী, শিশু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার এবং বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে এ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি এ সংস্থারটির নির্বাহী পরিচালক। ইতোমধ্যে তার সংস্থাতে ১০৪ জনের কর্ম সংস্থান সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এছাড়াও নারী হেডম্যান ও কারবারীদের(প্রথাগত প্রধান) সাড়ে চার শত নারীদের নিয়ে নারী ক্ষমতায়ন, নারীদের বিচারিক অধিকার নিয়ে কাজ করা ছাড়াও চার হাজারের অধিক নারীকের হস্তশিল্প, পশুপালনে উদ্ধুব্ধ,স্মার্ট কৃষি প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণও দিয়েছেন। যা এসব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীরা নিজেদের পারিবারিক ও সমাজে অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রেখে যাচ্ছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি নারী, শিশু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন
রাঙামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নে জন্ম সূচরিতা চাকমা। পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলেও তিনি চট্টগ্রামে রাউজান উপজেলা কুন্ডেশ^রী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে মাধ্যমিক পাশ করার পর তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়। তবে বিবাহের পরও তার লেখাপড়া প্রবল আগ্রহ থাকায় তিনি স্নাতক পাশ করেন। এরপর শুরু হয় তার জীবন সংগ্রাম। তিনি প্রথমে রাঙামাটিতে আদিবাসী সংস্কৃতি ধরে রাখতে তাতঁ শিল্প ব্যবসা(পিনোন-হাদি) শুরু করেন অল্প পুজিতে। সেখানে তার ৩৬ জন কর্মচারী ছিল। এ তাতঁ শিল্প ব্যবসায় কিছুটা সফল হলেও পরে পাহাড়ের এ শিল্পে নকল প্রবণতা বাড়ায় তার ভাটা পড়ায় তিনি এ ব্যবসা ছেড়ে দেন। এরপর তার মাথায় আসে কিভাবে নারী-পুরুষের বৈষম্য দুর করা যায়, পিছিয়ে পড়া নারীদের অধিকার কার্যক্রম বাস্তবায়ন, ক্ষমতায়ন ও নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করা যায়। এ লক্ষে তিনি ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন প্রোগ্রেসিভ নামে সংস্থাটি। প্রথমে ঘুরে দাড়াঁতে না পারলেও ২০০৮ সাল থেকে মাত্র চার জন কর্মচারীকে নিয়ে পুরোদমে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে এ প্রোগ্রেসিভ সংস্থাতে ১০৪ জন কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। যার মধ্যে নারী ৬৩ জন ও পুরুষ ৪১ জন। রাঙামাটি ছাড়াও বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে এ সংস্থার শাখা অফিস রয়েছে। সেখানেও নারীদের ক্ষমতায়নসহ নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের কার্যক্রম চলছে তার সংস্হাতে।
বর্তমান প্রোগ্রেসিভ সংস্থাটি নারীদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ডিজিটাল মার্কেটিং, কম্পিউটার অপারেশন প্রশিক্ষণ, সেলাই, বুটিকস,ড্রেস মেকিং, স্কিন প্রিন্ট,পশুপালন, স্মার্ট কৃষি চাষে প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন হাতের কাজে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে চার হাজারের অধিক নারী প্রশিক্ষণ গ্রহন করেছেন। ডিজিটিল মার্কেটিং এ প্রশিক্ষণ পেয়ে ইতোমধ্যে ৫জন পাহাড়ী নারী জাপানে চাকরীও পেয়েছেন। তাছাড়াও নারীদের কারিগরী দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়াও তার এ সংস্থাটির জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে সচেতনামূলক কার্যক্রম, বাল্য বিবাহ,পুষ্টি, নারীদের নিরাপত্তা, নারী-শিশু সহিংসতা ও নির্যাতন প্রতিরোধের ভূুমিকা,ভিক্টিম নারীদের পারিবারিকসহ আইনগত সহায়তাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে ৩জন ভিক্টিম নারীকে কর্মসংস্থানের সৃষ্টিও করে দিয়েছেন। এ সংস্থার নিজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে প্রশিক্ষণ পাওয়া ১২ জন নারীর তৈরী করা বিভিন্ন কাপড়-চোপড়ের ২টি আউলেড শো রুম রয়েছে। আদিবাসী পাহাড়ীদের সংস্কৃতি ধরে রাখতে ঐতিহ্যবাহী পিনোন-হাদি তৈরীসহ হস্ত শিল্প উৎপাদনে প্রকল্পও গ্রহন করেছে এ সংস্থাটি।
এছাড়াও তৃণমূল পর্যায়ে আদিবাসী পাহাড়ী নারীরা নেতৃত্ব দিতে এবং নারীরা তাদের সামাজিক ও বিচারিক ক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকার ও বলার সুযোগ পায় তার জন্য কাজ করেছেন। চাকমা রাজ সার্কেলের অধীনে থাকা ২৩০ নারী কারবারী(গ্রাম প্রধান) ও হেডম্যান(মৌজা প্রধান) থেকে উন্নীত করে ৪৫০ জন করা হয়েছে সংস্থাটির এ্যাডভোকেসির মাধ্যমে। এর ফলে কমিউনিটি পর্যায়ে নারীরা তাদের বিচারিক ও সামাজিক অংশ গ্রহনে নিশ্চিত হয়েছে।
পাহাড়ের এ সফল নারী সূচরিতা চাকমা বলেন, পাহাড়ে নারীরা পুরুষের চেয়ে এখনো পিছিয়ে রয়েছে। পাহাড়ের সামাজিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারীরা উঠতে পারছে না। বিশেষ করে ডিজিটাল এর মাধমে এ অবক্ষয় হচ্ছে। নারীবাদকে অন্য দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নারীরা কম অধিকার পাচ্ছে তা পুরুষের মনে উদয় হচ্ছে না। তবে তার একটা সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে এ বৈষম্য ও সংঘাত থাকবে না।
তিনি আরো বলেন, নারীদের এগিয়ে নিতে হলে নারীদের সুযোগ ও স্বাধীনতা দিতে হবে। পাশাপাশি নারীদের নিরাপত্তা দিতে হবে। তাহলে নারীরা ঘুরে দাড়াঁতে পারবে।

--হিলবিডি২৪/সম্পাদনা/সিআর.

উপদেষ্টা সম্পাদক : সুনীল কান্তি দে
সম্পাদক : সত্রং চাকমা

মোহাম্মদীয়া মার্কেট, কাটা পাহাড় লেন, বনরুপা, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা।
ইমেইল : info@hillbd24.com
সকল স্বত্ব hillbd24.com কর্তৃক সংরক্ষিত